মলাট ও নতুন বই পাওয়ার আনন্দ

পুরানো স্মৃতি সত্যিই কখনো ভোলার নয়। নতুন বই পাওয়ার ও মলাট বা পুরানো বই  এ মলাট লাগানো যেন মনের আলাদা এক প্রশান্তি । যখন স্কুলে যেতাম তখন সম্ভবত ক্লাস থ্রি বা ফোরে তে পড়ি নিজেই মলাট করার কৌশল টা মনযোগ দিয়ে দেখতাম। দুইটা বই সরকার থেকে দেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য, বাকী বইগুলো কিনতে হতো বা নিজ স্কুল থেকেই পুরান দিত। নতুন বই নিয়ে সহপাঠীদের সাথে বাড়ি ফেরতাম দেখতাম কার ভাগ্যে কোন বিষয় নতুন পড়েছে। তখন স্কুল থেকে বই এনে দুই তিন দিন বইয়ের ঘ্রান নিতাম আর পাতা উল্টিয়ে পালটিয়ে দেখতাম।তারপর সব বইয়ের পৃষ্টা উল্টিয়ে বইয়ে যতগুলো ছবি আছে সবগুলো দেখতাম। বইয়ে মলাট লাগানো, মলাটের সুন্দর নাম, ক্লাস, ডিপার্টমেন্ট, রোল লেখা কত শত স্মৃতি নতুন বই নিয়ে।

নতুন বই পাওয়ার আনন্দ

তারপর বাজার থেকে কাগজ এনে বা গতবারের ক্যালেন্ডারের পাতা দিয়ে বই মলাট বাধাই করতাম। আবার নতুন বই কেনার সেই সামর্থ্য ছিলো না সহপাঠিদের বাবার। পাড়ার  বড় বোন ভাইয়ের বই আর নোট সাথে নিজের নতুন কিছু কেনা বই। এভাবেই পড়তাম তবে বই নতুন হোক বা পুরনো, ক্যালেন্ডার বা সিমেন্ট এর ব্যাগ দিয়ে মলাট লাগাতে ভুল করত না অনেকেই।গ্রামাঞ্চলের নব্বই শতাংশ ছাত্র ছাত্রীর এই অবস্থার মধ্য দিয়ে তখন পার হতে হত। কারও  মা দাদা দাদু বড় ভাই  মলাট করে দিতেন, সিমেন্ট এর প্যাকেট সুতা দিয়ে সেই মলাট সেলাই দিতেন পুরাতন ক্যালেন্ডার দিয়ে। ধীরে ধীরে ক্লাস বাড়ার সাথে সাথে নিজেরা ও শিখে নেই।

সম্প্রতি সম্প্রতি জনপ্রিয় টিভি অভিনেতা গায়ক চঞ্চল চৌধুরী স্যার এর সোস্যাল মিডিয়া ফেসবুকে একটা পোস্ট  মাধ্যমে ছেলের নতুন বই মলাট নিয়ে লিখেন আর তা তুলে ধরা হল।বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক সহ অন্যান্য ব্যাংক পরীক্ষার প্রস্তুতি

মলাট কাহিনী
স্কুল জীবনে নতুন ক্লাশে ওঠার পর বইয়ে মলাট লাগানোর কথা সবারই মনে থাকার কথা।
আমরা যারা গ্রামের স্কুলে পড়ালেখা করেছি,তাদের অভিজ্ঞতা একটু ভিন্ন রকমের।
নতুন ক্লাশের নতুন বই,
মলাট লাগানো….
এগুলো ছিলো উৎসবের মত।

পুরনো ক্যালেন্ডার/সিমেন্টের ব্যাগ দিয়ে নতুন ক্লাশের বইয়ে মলাট দেয়া,
এখনোও স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।
যাদের নতুন বই কেনার সামর্থ্য ছিল,
তাদের আনন্দ টা ছিল ভিন্ন মাত্রার।

দুটি কারনে আমার কখনো স্কুল জীবনে
নতুন বই পড়া হয়নি।
প্রথমত: আমার আগের বোনটি আমার এক ক্লাশ উপরে পড়তো,
পুরো স্কুল জীবন ওর পুরনো বই আমাকে পড়তে হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: দারিদ্রতার কারনে আমাদের বাবার সামর্থ্যই ছিলো না,নতুন বই কিনে দেবার।

নতুন ক্লাশে ওঠার পর যখন দেখতাম,সহপাঠীরা নতুন চকচকা বই পড়ছে,তখন খুব লোভ হতো।
আর সে কারনেই প্রায় কোমায় চলে যাওয়া,পুরনো বইগুলোকে খুব সুন্দর করে মলাট লাগিয়ে,
বইয়ের ক্ষত আর নিজের মনের ক্ষত,
দুটোই ঢেকে রাখতে রাখতেই স্কুল জীবন পার করেছি।
অবশ্য শান্তি একটাই,
পুরনো ছেড়া বই পড়েও,
নতুন বই পড়া সহপাঠীদের সাথে পাল্লা দিয়ে ক্লাশে প্রথম বা দ্বিতীয় হতাম।
আসলে,ছাত্র হিসেবে তো খারাপ ছিলাম না!

আজ যখন আমার ছেলে শুদ্ধ’র
নতুন ক্লাশের নতুন বইতে,
আদর করে মলাট লাগিয়ে দিচ্ছিলাম,
তখন সত্যি উৎসব মনে হচ্ছিলো।
ছোট বেলার এরকম অনেক ছোট ছোট অপ্রাপ্তি গুলো ভুলতে ভুলতেই আজ এখানে পৌঁছানো।
আমাদের সন্তানেরা,
যদি শুধু এটুকু বুঝতে পারতো যে,
সারা জীবন ছেড়া বই পড়ে,
তোমাদের বাবারা তোমাদের হাতে এক সেট নতুন বই তুলে দিতে পেরে নিজেদের অপ্রাপ্তির সব কষ্ট ভুলে যায়,
তাহলে বোধ হয় ওরা সত্যিই মানুষ হবার প্রেরনা পেতো।
তাহলে আমাদের জীবন সংগ্রামও সার্থক হতো।
এখনো আমি,
আমার ছোটবেলার সেই নতুন বই পড়া সহপাঠীদের চেয়ে,
ছেড়া বা পুরনো বই পড়া সহপাঠীদেরকেই বেশী খুঁজে বেড়াই।
আর মনে মনে প্রার্থনা করি,
আমাদের সন্তানেরা মানুষ হোক।এইচ এস সি 2020 শিক্ষার্থীরা ফরম পূরণের টাকা আজ থেকে যেভাবে ফেরত পাবেন ।

( বি: দ্র: আমাদের ছেলে শুদ্ধ, করোনা সময়ে শুধু অনলাইনে ক্লাশ করেই, চতুর্থ থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে উঠে গেল।
আহারে অনলাইন… আবার যে কবে ওরা স্কুল জীবন শুরু করবে,সেই আশাতেই আছি )
বিশেষ কৃতজ্ঞতা #Chanchal Chowdhury স্যার এর লিখার জন্য অনেক সৃতি ভেসে উঠছে ।